Header Ads

হরতালের জন্ম-বিস্তার যেভাবে ...

হরতাল বর্তমানে খুবই প্রচলিত একটি শব্দ। অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে হরতালের ব্যবহার প্রথমে শুরু হলেও বর্তমানে এটি অনেক দেশে জনগণের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুলি, বোমাবাজি, হামলা, মামলা, হত্যাযজ্ঞ, ধ্বংসযজ্ঞ বর্তমানে হরতাল দিনের নিত্য সঙ্গী। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে হরতালের বিভিন্ন নাম রয়েছে তবে মোটামুটি হরতালের নিয়ম ও পরিধি একই। এক সময় বিশ্বে কোথাও হরতালের প্রচলন ছিল না তবে এটি বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সকল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটি ঢুকে গেছে।

তবে স্বৈরতান্ত্রিক ও রাজতান্ত্রিক অনেকে দেশে এখনও হরতালের বৈধতা নেই। কারণ এই সকল দেশে জনগণের মতামতকে খুব একটা মূল্য দেওয়া হয় না। তবে ধারনা করা হয় অল্প কিছু সময় বাদে হয়তো এই সকল রাষ্ট্রেও এক সময় হরতাল প্রবেশ করবে।

হরতাল শব্দটি গুজরাটি শব্দ। যার বাংলা অর্থ দাড়ায় ধর্মঘট। বর্তমানে হরতাল শব্দটি বাংলা শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। হরতাল বলতে বুঝানো হয় সেই সময়টাতে অফিস-আদালত, ব্যাংক-বীমা, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, বাস-ট্রেন সহ সকল প্রকার যানবাহন বন্ধ থাকবে। হরতাল পালন করার জন্য হরতাল আহ্বানকারীরা রাস্তায় প্রতিরোধ সৃষ্টি করবে এবং মিছিল মিটিং করবে। হরতাল সম্পর্কে আসলে বর্তমান ধারনা এমনই। নির্দিষ্ট দাবী আদায়ের জন্য যেকোনো গোষ্ঠ, সংগঠন বা রাজনৈতিক দল কর্তৃক হরতাল আহবান করতে পারে। কারণ এটি সাংবিধানিক ভাবে স্বীকৃত গণতান্ত্রিক অধিকার। বর্তমানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক ভাবে বেশী হরতাল পালন করা হয়। 

সামান্য যে কোনও দাবী-দাওয়া পূরণ করার দাবীতে এখানে রাজনৈতিক দলেরা হরতাল আহবান করে থাকে। শুধু বাংলাদেশ নয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক ভাবে হরতাল পালন করা হয়। তবে সকল দেশেই এই পদ্ধতির নাম হরতাল নয়। যেমন ভারতে বলা হয় বনধ্‌ এবং যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে বলা হয় স্ট্রাইক। যখন সরকারি দল কোনও বিষয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নেয় তখন সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য ও জনগণকে সচেতন করতে বিরোধী দলেরা হরতাল আহবান করে থাকে। 

১৯২০ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে রাজনৈতিক ভাবে হরতাল পালন বৃদ্ধি পায়, এর ফলে হরতাল একটি আলাদা স্বকীয়তা লাভ করে। সে সময় ভারতের জাতির পিতা মহান্তা গান্ধী গুজরাট কেন্দ্রিক ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের ক্ষেত্রে হরতালের সূচনা করেন। সে সময় ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করতে তিনি বেশ কিছু হরতালের ডাক দিয়েছিলেন। বর্তমানেও ভারতে বিভিন্ন প্রদেশে বিভিন্ন সময়ে হরতাল বা বনধ্‌ পালিত হয়ে থাকে। বর্তমানে বিশ্বে সবচেয়ে বেশী হরতাল পালিত হয়ে থাকে বাংলাদেশেরাজনৈতিক অসংহতি, বিরোধ ও স্বার্থপরতার কারণে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সবচেয়ে বেশী হরতাল পালন করে থাকে। হরতাল শান্তিপূর্ণ হওয়ার কথা থাকলেও বাংলাদেশের হরতালগুলো খুবই ধ্বংসাত্মক হয়ে থাকে। 

হামলা, সংঘর্ষ, গুলি, বোমা ও নৈরাজ্যের মধ্য দিয়ে এখানে হরতাল পালিত হয়। এমনকি হরতালে একাধিক মানুষ নিহত হওয়ারও নজির রয়েছে। হরতালের এক একটি দিনের কারণে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থের ক্ষতি হয়ে থাকে এবং সাধারণ মানুষের জীবন-যাত্রা অসহনীয় ও নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সময় বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ডাকে বেশ কিছু ফলপ্রসূ হরতাল পালিত হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশী হরতাল পালন করেছে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ নামক রাজনৈতিক দলটি। এই দলটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকা রাখলেও পরবর্তীতে বারবার হরতাল ডেকে এই দলটিই আবার দেশের সবচেয়ে বেশী অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করেছে।

ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের সময় মহত্না গান্ধী কর্তৃক হরতাল আহবান করলে মূলত ভারতীয় উপমহাদেশে হরতালের বিস্তার লাভ করেছিল। হরতালের আরও একটি প্রকারের মধ্যে পড়ে Wild cat strike, যেটি শ্রমিক ইউনিয়নের কর্মীরা কর্তৃপক্ষকে অগ্রাহ্য করে ধর্মঘট করলে বুঝানো হয়। Work in নামক আরও এক ধরনের হরতাল কর্মসূচি রয়েছে, এতে সরাসরি ভাংচুর, ধরপাকড়, বোমাবাজি করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে বেশীর ভাগই Work in পদ্ধতিতে হরতাল পালিত হয়।

বিশ্বে এ পর্যন্ত বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে অনেক উল্লেখযোগ্য হরতাল পালিত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কয়েকটি হচ্ছে, ১৮৯৪ সালে আমেরিকার Pull man strike, ১৯২০ পরবর্তী ভারতে মহত্না গান্ধী কর্তৃক ব্রিটিশ বিরোধী হরতাল, ১৯২৩ সালে অস্ট্রেলিয়ায় Victorians Police Strike, ১৯৩৫ সালে আমেরিকার শ্রমিক ধর্মঘট, ১৯৫৩ সালে শ্রীলংকার United National Party কর্তৃক সরকার বিরোধী হরতাল, ১৯৬৮ সালে ফ্রান্সে শ্রমিক ধর্মঘট। ১৯৭০ সালের আমেরিকার Pastal Strike, ১৯৭১ সালে শেখ মুজিবর রহমান কর্তৃক বাংলাদেশের পাকিস্তান বিরোধী হরতাল, ২০০৬ সালে গার্মেন্টস কর্মীদের Dhaka Strike, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশে এরশাদ সরকার বিরোধী হরতাল, ১৯৯৬ ও ২০০৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কর্তৃক সরকার বিরোধী হরতাল।

১৯১৭ সালের আগে হরতাল বা ধর্মঘটের সাংবিধানিক কোনও স্বীকৃতি ছিল না। ওই বছরই সর্বপ্রথম মেক্সিকোর সংবিধানে এই অধিকারটির স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এরপর ধারাবাহিকভাবে এটি বিভিন্ন দেশের সংবিধান কর্তৃক স্বীকৃতি লাভ করে এবং গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও বর্তমানে হরতালকে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যবহার করা হয়। হরতালের যেমন উপকারিতা রয়েছে তেমনি এর রয়েছে অপকারিতা। 

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো দেশে হরতালের উপকারিতা বেশী হলেও বাংলাদেশ ও ভারতের মতো দেশে হরতালের অপকারিতা এতই বেশী যে এখন জনগণের নিকট থেকে সোচ্চার দাবী উঠছে হরতালকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.