Header Ads

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন বনাঞ্চলের পরিচয়

জল, স্থল ও বনাঞ্চল নিয়ে গঠিত আমাদের এই আবাসভূমি পৃথিবী। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কয়েকশত বন। এই বনগুলোর মধ্যে কিছু বন আছে আমাদের পরিচিত আবার কিছু বন আছে আমাদের অপরিচিত। পরিচিত অপরিচিত এই সব বনের মধ্যে আবার কিছু বন আছে যে বনগুলো অনেক পুরাতন ও ব্যতিক্রমী। বিশেষ কিছু কারণে এই বন গুলো মানুষের কাছে ব্যতিক্রমী বা অদ্ভুত রূপে পরিচিত হয়েছে। যার অধিকাংশই অনেক পুরাতন বন।

রকমারি ওয়েব সাইটটি নিয়মিত আপনাদের জানা, অজানা বিভিন্ন তথ্য জানিয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতাই আজকে আমরা বিশ্বের ব্যতিক্রমী কিছু বন সম্পর্কে জানার চেষ্টা করবো।

শেরউড ফরেস্ট:


ইংল্যান্ডের নটেনহ্যামশায়ারে অবস্থিত শেরউড বনটি। এই বনের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক ডাকাতের ইতিহাস। যে কিনা ধনীদের কাছ থেকে লুট করা সম্পত্তি গরিবদের মাঝে ভাগ-বাটোয়ারা করে দিত। আপনারা অনেকেই চিনেন এই ডাকাতকে। কারণ, তার কাহিনী বা টিভি সিরিজে আপনারা অনেকেই দেখেছেন। হ্যাঁ, তার নাম রবিনহুড শেরউড বনটি সেই বিখ্যাত রবিনহুডের বনরবিনহুডকে এই বনের ডাকাত বলা হলেও তিনি ছিলেন গরিবের বন্ধু।

আগের দিনের ধনী লোকেরা ছিল খুবই অত্যাচারী, তাই তিনি ধনীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তাদের সম্পদ ছিনিয়ে এনে গরিবদের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। তাই তখন থেকেই রবিনহুডকে এই বনের ডাকাত বলা হতো। এ বনটি একসময় সবুজে ভরা ছিল। কিন্তু এখন আর তেমন সুন্দর নেই। আগে এই বনটির এরিয়া ছিল ১ হাজার ৪৫ একরের বেশী থাকলেও বর্তমানে এর এরিয়া কমে এসেছে বছরের পর বছর এ বনের পুরনো গাছগুলো কেটে ফেলায় আজ এ বনের করুণ হাল। বর্তমানে এই বনটি নটেনহ্যামশায়ারের একটি পর্যটন কেন্দ্র। 

মানুষেরা এই বনে শিকারের জন্য এসে থাকে। ১৯৬৯ সাল থেকে এই বনের কিছু অংশ মানুষের যাতায়াতের জন্য ছেড়ে দেয়া হয়েছে। ২০০২ সাল থেকে এই বনের কিছু অংশ জাতীয় প্রকৃতি সংরক্ষণ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এই বনের প্রধান বৃক্ষের নাম ওক গাছ। বর্তমানেও এই বনের একটি অংশে অনেক পুরাতন ওক গাছ আছে। এমন অনেকগুলো ওক গাছ আছে যাদের বয়স ৮০০ থেকে ১২০০ বছর। বনের সেই অংশটির নাম ডিউকেরিস। এই বনের প্রচার-প্রচারণা বেড়েছে মূলত রবিন হুডের কাহিনীকে কেন্দ্র করে। প্রতি বছর এই বনে প্রায় ৫ লাখ পর্যটকের আগমন ঘটে থাকে।

ক্লাউড ফরেস্ট

দি ক্লাউড ফরেস্ট:


ক্লাউড ফরেস্ট শব্দের বাংলা অর্থ 'মেঘ বন'। বনটির নাম শুনলে মনে হয় এই বনের আকাশ সর্বদা মেঘাচ্ছন্ন থাকে। এই বনের আরও একটি নাম আছে, আর সেটি হচ্ছে দি ফগ ফরেস্ট বা কুয়াশার বন। এটি মূলত একটি ট্রপিক্যাল বন। ধরনের বন পৃথিবীর অনেক জায়গায় আছে। তবে বেশি দেখা যায় এশিয়া আর আমেরিকা অঞ্চলেএই ধরনের বনগুলো পরিবেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। 

কারণ এই ধরনের বনগুলো বিশুদ্ধ পানি আর বাতাসের একটি বিশেষ উৎস। এই বনগুলো বাতাসে অক্সিজেনের সরবরাহ ঠিক রাখার পাশাপাশি খাবার পানিরও জোগান দেয়। মধ্য আমেরিকার গুয়াতেমালা দেশটিতে খাবার পানির প্রায় ৪০ শতাংশই আসে এ বন থেকে। কিন্তু গাছ কেটে ফেলার কারণে এ বনটিও আস্তে আস্তে ছোট হয়ে যাচ্ছে। ট্রপিক্যাল বনগুলো সাধারণত সমুদ্র থেকে ৪০০-৪০০০ মিটার উপরে হয়ে থাকে। এই  বনগুলোতে ঘন ঘন বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। বেশী বেশী বৃষ্টিপাতের কারণে এখানে সর্বদা মেঘাচ্ছন্ন বা কুয়াশাচ্ছন্ন থাকে। 

বেশী বেশী বৃষ্টিপাতের কারণে এই সকল বনে প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষ জন্মে থাকে। ক্লাউড ফরেস্ট গুলোতে বছরে প্রায় ৫০০-১০০০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়ে থাকে। সারা বছর এখানের তাপমাত্রা ৮-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে। বিশ্বজুড়ে প্রধান প্রধান কয়েকটি ক্লাউড ফরেস্টের মধ্যে রয়েছে মোসি ফরেস্ট, ইলফিন ফরেস্ট, নেবলিনা ইত্যাদি। বিশ্ব জুড়ে ক্লাউড ফরেস্ট গুলো অবস্থিত দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা, পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও ফিলিপাইন, পাপুয়া নিউগিনি ও ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে।
শেরউড ফরেস্ট

দ্য টংগাস ফরেস্ট:


টংগাস বনটি পৃথিবীর একমাত্র নাতিশীতোষ্ণ রেইনফরেস্ট, যার পাশেই সাগর অবস্থিত। এটি আমেরিকার আলাস্কায় অবস্থিত। এই বনটিই আমেরিকার সবচেয়ে বড় বন। এর আয়তন ১৭ মিলিয়ন একর বা ৬৯ হাজার বর্গ কিলোমিটার। এই বনের সীমান্ত দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কানাডার আন্তর্জাতিক সীমান্ত। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ১৯০২ সালের ২০ আগস্ট Alexander Archipelago Forest Reserve প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর ১৯০৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর রুজভেল্ট টংগাস জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০৮ সালের ০১ জুলাই এই মার্কিন প্রেসিডেন্ট বন দুটিকে একত্রিত করেন। এই বনে বর্তমানে প্রায় ৭৫০০০ লোকের বসবাস রয়েছে, যাদের জীবন এই বনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। তিলিংগিট, হাইদা ও সিমসাইন নামক কয়েকটি উপজাতিরও বসবাস রয়েছে এই বনে।


দ্য টংগাস ফরেস্টে বিনোদনের জন্য অনেক সুবিধা রয়েছে। প্রতি বছর আলাস্কার এই বনে এক মিলিয়নের মতো পর্যটক আসে। এই বনে ভ্রমণার্থীদের জন্য প্রায় ১৫০টি কেবিন রয়েছে। এছাড়া এখানে হাইকিং, রাইডিং, সুইমিং সহ বিভিন্ন ধরনের বিনোদনের সুযোগ রয়েছে। এই বনে রয়েছে বিভিন্ন জাতের কোটি কোটি গাছের সমাহার। ১৯৯০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে শুধু মাত্র শুধু ঘন গাছে ঢাকা এলাকা রয়েছে। এই বনটি আমেরিকা সরকার কর্তৃক পরিচালিত ও রক্ষণাবেক্ষণ হয়ে থাকে।

দ্য গ্রেট বিয়ার ফরেস্ট:


বিয়ার শব্দের বাংলা অর্থ ভাল্লুক। আজব নামের বনটি কানাডার পশ্চিমে সাগরের তীরে অবস্থিত। এই বনটিকে আবার নর্থ ও সেন্ট্রাল কোস্ট বলা হয়ে থাকে। এই বনের অসমান এলাকা সমূহের আয়তন ৭০ হাজার বর্গ কিলোমিটার বা ২৭ হাজার বর্গ মাইল। এছাড়া এই বনের কিছু এলাকা আছে সংরক্ষিত ও পর্যটনের জন্য নির্ধারিত। সেই এলাকা সমূহের আয়তন ২০ হাজার বর্গ কিলোমিটার বা ৭৭০০ বর্গমাইল। এছাড়াও ৩ হাজার বর্গ কিলোমিটারের এলাকা রয়েছে যেগুলো বানিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত এলাকা।  এ বনটিও একসময় হুমকির মুখে ছিল। কিন্তু ২০০৬ সালে এ বনের ৫০ লাখ একর জায়গা বাঁচানোর জন্য একটি চুক্তি করা হয়েছিল। এই বনের সীমান্ত ডিসকভারি আইল্যান্ডের দক্ষিণ থেকে উত্তরের আলাস্কা সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই বনে ১ হাজার বছর বয়সী বিভিন্ন গাছ দেখতে পাওয়া যায়। 

মাউ ফরেস্ট:


বনটি পৃথিবীর অন্যতম একটি পুরাতন বন। এই বনটি কেনিয়ার রীফ ভ্যালিতে অবস্থিত। এই বনের মোট জমির পরিমাণ ২৭৩৩০০ হেক্টর। এই বনে পুরাতন ও উচ্চতম কিছু জলপ্রপাত রয়েছে। এই বনটিই কেনিয়ার সবচেয়ে বড় জলাধার। মাউ বনের মধ্য দিয়ে অনেক নদী প্রবাহিত হয়েছে। যার মধ্যে অন্যতম রয়েছে ইয়াসো ইনজিরো, সোন্দু, মারা, এনজোরো নদী। এই নদীগুলোই পানি সরবরাহ করে ভিক্টোরিয়া, নাকুরু ও নাটরন লেকে। 

ওজিয়েক নামক জনসাধারণ বহু বছর ধরে এই বনাঞ্চলে বসবাস করে আসছে। এই বনের প্রধান সমস্যা যে, বন থেকে ব্যাপকভাবে গাছ কাটার ফলে বন উজাড় হয়ে যাচ্ছে। ২০০৮ সালের ১৫ জুলাই প্রেসিডেন্ট রেইলা ওডেন্গা এই বনকে সংরক্ষণের কথা ঘোষণা করেন।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.