Header Ads

আশ্চর্য অট্রালিকা হিরোশিমার এটোমিক বোম্ব ডোম

আমাদের এই নশ্বর পৃথিবীর আনাচে কানাচে কত রকম যে বিশ্ময়কর জিনিস লুকিয়ে আছে তা আমরা হয়তো অনেকেই জানি আবার অনেকেই জানি না। কিংবা আবার আমরা এইভাবে বলতে পারি যে, পৃথিবীর ইতিহাসে কত রকম যে বিশ্বয়কর ঘটনা ঘটেছে আমরা সেই গুলোও সঠিকভাবে জানি না। আসলে এই পৃথিবীতে এমন অনেক ঘটনা আছে যা সত্যিই বিশ্ময়কর এবং অবিশাস্য। এমন অনেক ঘটনা আছে যা আমাদের চিন্তার উদ্রেক করে এবং আমাদের অবচেতন মনকে ভাবিয়ে তুলে। এই ধরুন আমি যদি আপনাকে বলি যে কোনও শহরে একটি পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হলো এবং সেই শহরের সমস্ত বাড়ি-ঘর, ব্রিজ, কালভার্ট সহ সকল স্থাপনা নিমিষেই ধ্বংস হয়ে গুড়া গুড়া হয়ে গেল কিন্তু মাত্র একটি বাড়ি ছাড়া। এবার কি আপনার মনে সত্যিই চিন্তার উদ্রেক করবে না? যেখানে শহরের সমস্ত স্থাপনা গুলো ভেঙ্গে গুড়া গুড়া হয়ে গেছে সেখানে মাত্র একটি ঘর অক্ষত থাকে কি করে? আসলে কথাটা সত্য। 

যেখানে বা যে শহরে পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো হয় তার সেই শহর তো আছেই তার সাথে কয়েকটি শহর ধুলিসাৎ হয়ে যায়। তবে হ্যা, সত্যিই এই পৃথিবীতে এমন একটি বাড়ি আছে যেটি পারমানবিক বোমার আঘাতেও ধ্বংস হয়নি। আরও যদি পরিস্কার করে বলি পারমানবিক বোমাটি উপর থেকে পড়ে ছিল এই বাড়ির কম্পাউন্ডে তারপর সেই বোমার প্রভাবে ধুলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল সেই শহরের সকল বাড়ি-ঘর, রাস্তা, ঘাট, ব্রিজ, গাছ, টাওয়ার সহ সবকিছু কিন্তু শুধু মাত্র এই ঘরটি ছিল অক্ষত। কিন্তু কেন? কিন্তু কেন? কেন এই ঘরটি অক্ষত ছিল? এই ঘরটির এমন কি ক্ষমতা ছিল যার কারণে পারমানবিক বোমাও এই ঘরটিকে ধ্বংস করতে পারে নি?

আমি যে ঘরটির কথা বলছি এটির নাম এটোমিক বোম্ব ডোম্ব। ৭৪ বছর পরও ঘরটি এখনও দাড়িয়ে আছে সেই ভাবে ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে। এই ঘরটি সম্পর্কে জানার পূর্বে আমাদের জানা উচিত সেই সময়ের পৃথিবীর অবস্থা সম্পর্কে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এ যাবৎকাল পর্যন্ত সংঘটিত সর্ববৃহৎ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ যুদ্ধ ছিল ২য় বিশ্বযুদ্ধ। ১৯৩৯ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল, এই ছয় বছর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়সীমা ধরা হলেও ১৯৩৯ সালের আগে এশিয়ায় সংগঠিত কয়েকটি সংঘর্ষকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ হিসেবে গণ্য করা হয়। তৎকালীন বিশ্বে সকল পরাশক্তি এবং বেশিরভাগ রাষ্ট্রই এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং দুইটি বিপরীত সামরিক জোটের সৃষ্টি হয়; মিত্রশক্তি আর অক্ষশক্তি। এই মহাসমরকে ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্তৃত যুদ্ধ বলে ধরা হয়, যাতে ৩০টি দেশের সব মিলিয়ে ১০ কোটিরও বেশি সামরিক সদস্য অংশগ্রহণ করে। এটা এমনই একটি যুদ্ধ ছিল যে যুদ্ধে প্রতিটি দেশ তার সামরিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সকল সক্ষমতা দিয়ে যুদ্ধ করেছিল। এছাড়া বেসামরিক জনগণের উপর চালানো নির্বিচার গণহত্যা, হিটলার কর্তৃক ইহুদীদের উপর চালানো গণহত্যা, পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রের প্রয়োগ সহ নানান ঘটনায় এই যুদ্ধে প্রায় ৫ কোটি থেকে সাড়ে ৮ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে।


এই যুদ্ধে নব্য আবিষ্কৃত অনেক প্রযুক্তির ধ্বংসাত্মক প্রয়োগ লক্ষ করা যায়এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ প্রয়োগ ছিল পারমাণবিক অস্ত্রের মহাযুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই এই মারণাস্ত্র উদ্ভাবিত হয় এবং এর ধ্বংসলীলার মধ্য দিয়েই যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যখন চলমান ঠিক তখনই সমস্ত বিশ্বকে অবাক করে দিয়ে ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট ঠিক সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমায় পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথম পারমানবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটায়। বোমাটি এসে সরাসরি হিরোশিমা শহরের যে বাড়িটির কম্পাউন্ডে পড়েছিল সেই বাড়িটি এটোমিক বোম্ব ডোম নামে পরিচিত। পারমানবিক বোমাটি এই বাড়িতে পড়ার পর বোমার শক্তি ও তার তিজস্ক্রিয়ায় সমগ্র হিরোশিমা শহর ধ্বংস ও বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিল শুধুমাত্র এই বাড়িটি ছাড়া। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে যেখানে বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছিলো সেই মূল কেন্দ্রে ছিল একটি গম্বুজাকৃতির অট্রালিকা বোমার আঘাতে সর্বপ্রথম এই অট্রালিকাটি সেকেন্ডের মধ্যে ধুলিসাৎ হয়ে যাওয়ার কথা কিন্তু এই অট্রালিকাটি ছিল তুলনামূলক ভাবে অন্যদের তুলনায় অক্ষত পারমানবিক বোমার আঘাতেও কেনো এই বিল্ডিংটি ধ্বংস হয়নি তার রয়েছে বৈজ্ঞানিক ব্যাখা। এই ব্যাখ্যা দিবো আমি আর একটু পরে। তার আগে চলুন এই বিল্ডিংটির বিষয়ে একটু জেনে আসি।

পারমানবিক বোমাটি মাটি থেকে ঠিক ৬০০ মিটার উপরে এবং এই বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে ১৬০ মিটার উপরে বিস্ফোরিত হয়।  জাপানের হিরোশিমা শহরে অবস্থিত এই বিল্ডিংটি তৎকালিন সময়ে ছিল একটি শিল্পকলা একাডেমি। ১৯১৫ সালে এই বিল্ডিংটি তৈরি করা হয় এবং ১৯২১ সালে এটি জনসাধারনের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। বিমান থেকে নিক্ষেপ করা বিশ্বের প্রথম পারমানবিক বোমাটির নাম ছিল লিটল বয় এবং এটি বিমান থেকে নিক্ষেপের মাত্র ৪৩ সেকেন্ড পরই বিস্ফোরিত হয়। লিটল বয় এর ধ্বংস ক্ষমতা ছিল ১৫ হাজার টন টিএনটি। বোমাটির বিস্ফোরণের সাথে সাথে এই বিল্ডিয়ে তখন অবস্থিত সকল মানুষ সাথে সাথেই নিহত হয়েছিল। বোমাটি বিস্ফোরিত হওয়ার সাথে সাথে প্রতি বর্গ মিটারে ৩৫ টন চাপের সৃস্টি করেছিল এবং তার তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার গতি ছিল বাতাসের সাথে ৪৪০ মিটার প্রতি সেকেন্ডে। বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার পর বাড়িটি ধ্বংস না হলেও সমগ্র বাড়িতে আগুন ধরে গিয়েছিল এবং এর সামনের অংশ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছিল।

এবার দেখা যাক এই বাড়িটি ধ্বংস না হলেও লিটল বয়ের আঘাতে হিরোশিমা শহরের কি অবস্থা হয়েছিল? হিরোশিমা শহরের পারমানবিক বোমার আঘাতে শহরের ৭০% ঘর, বাড়ি, মার্কেট, কলকারখান, রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ, টাওয়ার সবকিছু নিমিষেই ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। জীবনহানীর দিক থেকেও এটি ভয়াবহতার সকল রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার সাথে সাথেই প্রথম আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছিল ৭০ হাজার মানুষ। এবং বছর শেষে এই বোমার তেজক্রিয়তার মোট মৃত্যূর সংখ্যা দাড়িয়েছিল ১ লক্ষ ৭০ হাজার জন।


আবার ফিরে আসি এটোমিক বোম্ব ডোমের বিষয়ে। এবার আমরা জানবো বর্তমানে এই আজব ঘরের অবস্থা কি? মটোইছু নদীর তীরে অবস্থিত এই বাড়িটি এখন একটি পর্যটন কেন্দ্র এবং এটি হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্কের একটি অংশ। ১৯৯৬ সালে ইউনেস্কো এই জায়গাটিকে ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষনা করে। এই পার্কে বর্তমানে একটি বিশাল আকারের ঘন্টা বসানো আছে যেটিকে বলা হয় শান্তির ঘন্টা। শান্তি ও সমৃদ্ধির আশায় মানুষেরা এই ঘন্টা বাজিয়ে থাকে। এই ঘরের ইতিহাসকে ধরে রাখতে শিশুদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে একটি চিলড্রেন পিস মন্যুমেন্ট। শিশুরা এখানে আসে আনন্দ করে, মজা করে এবং সেই সাথে পারমানবিক অস্ত্রের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে জানতে পারে। বিশ্বকে পারমানবিক অস্ত্র মুক্ত করার শ্লোগানকে সামনে রেখে সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি প্রজ্জলিত শিখা। পাখির ডানার মতো দেখতে এই অগ্নি শিখা জ্বালিয়ে রাখা হবে যতদিন না পর্যন্ত পৃথিবী পরমানু অস্ত্র মুক্ত না হয়। 

হিরোশিমায় পারমানবিক বোমা হামলায় নিহতদে স্মরণে এই পার্কে নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মৃতিসৌধ। এই স্মৃতিসৌধে হামলায় নিহত সকল ব্যক্তিদের নাম লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এখনও প্রতিবছর নতুন নতুন নাম এই স্মৃতি সৌধে সংযুক্ত করা হয়। কারণ তৎকালিন সময়ে অনেকের পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি, কিন্তু এখন যাদের পরিচয় জানা যায় তাদের নাম এই সৌধে সংযুক্ত করা হয়। ১৯৫৫ সালে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি যাদুঘর। যেখানে হামলার পরবর্তী সময়ের ছবি, নিহতদের ছবি, পারমানবিক বোমার ছবি, যুদ্ধের ক্ষতিকর দিক এবং যুদ্ধের অনেক ডকুমেন্টারি দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করে রাখা হয়েছে। এখানে যুদ্ধের স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য একটি মেমোরিয়াল হল তৈরি করা হয়েছে এবং সেখানে বৃহদাকার একটি ঘড়ি স্থাপন করা হয়েছে। যুদ্ধে সময়কে স্মরণ রাখার জন্য এই ঘড়িতে সর্বদা ৮টা ১৫ মিনিট বাজিয়ে রাখা হয়েছে। কারণ ঠিক এই সময়ে হিরোশিমাতে পারমানবিক বোমাটি আছড়ে পড়েছিল।  এছাড়াও এখানে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে বিশ্রামগার, ফিনিক্স ট্রি, অই সেতু এবং হিরোশিমা অরিজুরু টাওয়ার।


এবার আমরা আলোচনা করবো এই বিশাল বোমা আছড়ে পড়ার পরও কেন এটোমিক বোম ডোম নামক বাড়িটি পরিপূর্ণ ধ্বংস হয়নি, যেখানে তার আশে পাশের কয়েক কিলোমিটারের সকল ঘর, বাড়ি, গাছ-পালা, ব্রিজ মার্কেট ধুলিসাৎ হয়েগিয়েছিল। কেন এই বাড়িটি অন্যন্য বাড়িদের মতো বিধ্বস্ত হয়নি এই বিষয়ে দুটি প্রধান মতবাদ রয়েছে। প্রথম মতবাদটি একটি বৈজ্ঞানিক মতবাদ। ধরুন কোনও বস্তুর পাশে একটি বোমা বিস্ফোরিত হলো এখন এই বস্তুটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে নাকি এর থেকে হালকা দুরত্বের বস্তু গুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে? আসলে বোমা যেখানে বিস্ফোরিত হয় এর একটি কেন্দ্র থাকে এবং সেই কেন্দ্র থেকে বোমার তীব্রতা সমভাবে এর চার দিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে যত দূরত্বে যায় তত এর তীব্রতা কমতে থাকে। কেন্দ্র থেকে তীব্রতা ছাড়ানোর কারণে ঠিক কেন্দ্রে ক্ষতির পরিমান একটু কম থাকে এবং কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় এর তীব্রতা এবং ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। এটোমিক বোম ডোমের ক্ষেত্রেও ঠিক এমনটাই ঘটেছিল। এই বাড়ির চূড়ার ঠিক ১৬০ মিটার উপরে বোমাটি বিস্ফোরিত হয়েছিল ফলে এই বাড়িটি ছিল বিস্ফোরণের কেন্দ্র এবং কেন্দ্র থেকে তীব্রতা চারধারে ছড়িয়ে পড়ার কারণে এই বাড়িটিতে ক্ষতির পরিমাণ একটু কম ছিল।

দ্বিতীয় যে কারণটি ধারনা করা হয় সেটি হচ্ছে এই বাড়ির কাঠামো। বাড়িটির অধিকাংশ কাঠামো ছিল স্টিলের এবং বোমার তীব্রতা উপর থেকে নিচের দিকে আসার কারণে স্টিল প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করেছিল। স্টিল গুলো বোমা বিধ্বস্ত হওয়ার পর আগুনে পুড়ে গেলেও এর কংক্রিটের কাঠামোটি অন্যন্য বাড়ির তুলনায় বেশি অক্ষত ছিল। সমগ্র হিরোশিমা শহর বিধ্বস্ত হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে তখনও এই বাড়িটি মাথা উচু করে ধ্বংস স্তুপের মধ্যে দাড়িয়েছিল।

কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.